প্রচ্ছদ / জাতীয়

জাতীয়

সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ, কতটা কমবে জ্বালানি আমদানির নির্ভরতা?

সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ, কতটা কমবে জ্বালানি আমদানির নির্ভরতা?

আমদানিনির্ভর জ্বালানির ওপর চাপ কমানো এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে বিশেষ প্রণোদনা দিয়েছে সরকার। জাতীয় রুফটপ সোলার কর্মসূচির আওতায় ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারির মধ্যে ৪ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ সক্ষমতা যুক্ত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

কর্মসূচির অগ্রগতি নিয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি বিস্তারিত তথ্য চেয়েছে। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, জাতীয় গ্রিডে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ থেকে কত বিদ্যুৎ যুক্ত হচ্ছে, সে বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের কাছে হিসাব চাওয়া হয়েছে। কর্মসূচির অগ্রগতি মূল্যায়নে স্থাপিত সক্ষমতার পাশাপাশি প্রকৃত উৎপাদন ও গ্রিডে সরবরাহের তথ্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

সৌরবিদ্যুতে বিশেষ প্রণোদনা

ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন বাড়াতে ২০২৬ সালের ১ সেপ্টেম্বর থেকে বিশেষ প্রণোদনা কার্যকর করেছে সরকার। এ ব্যবস্থায় নির্ধারিত শর্ত পূরণ করে ব্যাটারিসহ সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন এবং জাতীয় গ্রিডে উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ সরবরাহকারী গ্রাহকেরা প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের জন্য ১০ টাকা ৫০ পয়সা পাওয়ার সুযোগ পাবেন।

প্রণোদনার হিসাব অনুযায়ী, প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের সর্বোচ্চ উৎপাদন ব্যয় ৮ টাকা ধরে এর সঙ্গে ২০ শতাংশ মুনাফা ও ১১ দশমিক ২৫ শতাংশ প্রিমিয়াম যোগ করা হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করে গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করা যোগ্য গ্রাহকেরা ২০৩০ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এ সুবিধা পাবেন।

এ উদ্যোগের লক্ষ্য হলো বাড়ি, শিল্পকারখানা, বাণিজ্যিক ভবন ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ছাদে সৌর প্যানেল স্থাপনে বিনিয়োগ বাড়ানো। তবে প্রণোদনার প্রকৃত প্রভাব নির্ভর করবে কতসংখ্যক গ্রাহক এ সুবিধা নিচ্ছেন এবং কতটা বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে তার ওপর।

জ্বালানি আমদানির চাপ কতটা কমবে?

বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রাকৃতিক গ্যাস, কয়লা ও তেলের পাশাপাশি আমদানি করা জ্বালানির ওপরও নির্ভর করতে হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বেড়ে গেলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় ও দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার ওপর চাপ তৈরি হতে পারে।

এ পরিস্থিতিতে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ বাড়লে দিনের বেলায় শিল্পকারখানা, অফিস ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের বিদ্যুতের চাহিদার একটি অংশ নিজস্ব উৎপাদন থেকে মেটানো সম্ভব হবে। এতে গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ নেওয়ার প্রয়োজন কমতে পারে এবং কিছু ক্ষেত্রে প্রচলিত জ্বালানিচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর চাপও কমানো সম্ভব হতে পারে।

তবে সৌরবিদ্যুতের সক্ষমতা বাড়লেই জ্বালানি আমদানি একই অনুপাতে কমবে, এমনটি নিশ্চিত নয়। সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন দিনের আলো ও আবহাওয়ার ওপর নির্ভরশীল। সন্ধ্যা ও রাতে চাহিদা মেটাতে প্রচলিত বিদ্যুৎকেন্দ্র, গ্রিড এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যাটারিতে বিদ্যুৎ সংরক্ষণের ব্যবস্থা দরকার হবে।

এ ছাড়া স্থাপিত সৌর প্যানেলের মোট সক্ষমতা এবং সেখান থেকে বাস্তবে উৎপাদিত বিদ্যুতের পরিমাণ এক নয়। ফলে জ্বালানি আমদানিতে কতটা সাশ্রয় হবে, তা নির্ধারণে প্রকৃত উৎপাদন, বিদ্যুৎ ব্যবহারের ধরন এবং কোন জ্বালানির উৎপাদন কতটা প্রতিস্থাপিত হচ্ছে, তা হিসাব করতে হবে।

২০৩০ সালের লক্ষ্য পূরণে বাস্তবায়নই বড় চ্যালেঞ্জ

সরকারের নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণ পরিকল্পনায় ২০৩০ সালের মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদনে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ ২০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে। একই সময়ে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ থেকে ৫ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট সক্ষমতা অর্জনের লক্ষ্যও উল্লেখ করা হয়েছে।

এ লক্ষ্য অর্জনে সৌর প্যানেল স্থাপনের প্রাথমিক ব্যয় কমানো, সহজ অর্থায়ন নিশ্চিত করা, মানসম্মত সরঞ্জাম সরবরাহ এবং নেট মিটারিং ব্যবস্থা কার্যকর করা গুরুত্বপূর্ণ। নেট মিটারিংয়ের মাধ্যমে গ্রাহকেরা নিজেদের চাহিদা মেটানোর পর উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ গ্রিডে সরবরাহ করতে পারেন, যা ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতে বিনিয়োগের আগ্রহ বাড়াতে পারে।

একই সঙ্গে কর্মসূচির অগ্রগতি নিয়মিত প্রকাশ করা প্রয়োজন। কতটি স্থাপনায় সৌরবিদ্যুৎ বসানো হয়েছে, মোট কত মেগাওয়াট সক্ষমতা যুক্ত হয়েছে, প্রকৃত উৎপাদন কত এবং জাতীয় গ্রিডে কত বিদ্যুৎ সরবরাহ করা যাচ্ছে—এসব তথ্য প্রকাশ করা হলে লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের অগ্রগতি আরও স্পষ্ট হবে।

ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের সম্প্রসারণ বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার এবং আমদানিনির্ভরতার চাপ কমানোর একটি সম্ভাবনাময় উদ্যোগ। তবে এ উদ্যোগ কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে ঘোষিত লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে বাস্তব অগ্রগতি এবং উৎপাদিত বিদ্যুতের কার্যকর ব্যবহারের ওপর।