প্রচ্ছদ / জাতীয়

জাতীয়

গোয়ালন্দে আগাম পেঁয়াজ আবাদে ব্যস্ত কৃষক, সার সংকটের অভিযোগ

গোয়ালন্দে আগাম পেঁয়াজ আবাদে ব্যস্ত কৃষক, সার সংকটের অভিযোগ

রাজবাড়ী: বর্ষার পানি নেমে যাওয়ার পর রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলায় শুরু হয়েছে আগাম মুড়িকাঁটা পেঁয়াজের আবাদ। উপজেলার দৌলতদিয়া, উজানচর ও দেবগ্রাম ইউনিয়নের কৃষকরা ব্যস্ত সময় পার করছেন জমি প্রস্তুত ও চারা রোপণে। আবাদ শুরুর এ সময়ে চাহিদামতো সার না পাওয়ার অভিযোগ তুলেছেন কৃষকরা। তাদের দাবি, অতিরিক্ত টাকা দিয়েও কখনো সার সংগ্রহ করতে হচ্ছে। এর সঙ্গে শ্রমিকের মজুরি, সার ও কীটনাশকের দাম বাড়ায় উৎপাদন খরচ নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তারা।

কৃষকদের অভিযোগ, দিনের বেলায় প্রয়োজন অনুযায়ী সার না পেয়ে অনেক সময় রাতের আঁধারে অতিরিক্ত টাকা দিয়ে সার কিনতে হচ্ছে। নির্ধারিত সময়ে সার প্রয়োগ করতে না পারলে ফলন কমে যাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। অন্যদিকে উৎপাদনের পর বাজারে ন্যায্যমূল্য না পেলে লোকসানের মুখে পড়ার ভয় করছেন তারা।

গোয়ালন্দ উপজেলার বিভিন্ন মাঠ ঘুরে দেখা গেছে, বর্ষার পানি নেমে যাওয়ার পর কৃষকরা জমি প্রস্তুত করছেন। কেউ জমিতে সার দিচ্ছেন, আবার কেউ মুড়িকাঁটা পেঁয়াজের চারা রোপণে ব্যস্ত। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মাঠে চলছে কৃষিকাজ।

দৌলতদিয়া এলাকার কৃষক সাহিদুল খান বলেন, সময়মতো সার পাওয়া যাচ্ছে না। অতিরিক্ত টাকা দিলে রাতের আঁধারে সার পাওয়া যায়। শ্রমিকের মজুরির পাশাপাশি সার ও কীটনাশকের দামও বেড়েছে। পর্যাপ্ত সার না পাওয়ায় তারা বিপাকে পড়েছেন। পেঁয়াজ চাষে সময়মতো সার প্রয়োগ গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে তিনি কৃষকের চাহিদা অনুযায়ী সার সরবরাহ নিশ্চিত করার দাবি জানান।

আরেক কৃষক কালাম শেখ বলেন, ‘আমরা কৃষি কার্ড চাই না, সময়মতো ন্যায্যমূল্যে সার ও কীটনাশক চাই। পাশাপাশি উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য দাম চাই।’

তিনি জানান, বর্তমানে এক বিঘা জমিতে পেঁয়াজ আবাদ করতে প্রায় ৬০ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হচ্ছে। জমি প্রস্তুত, শ্রমিকের মজুরি, বীজ, সার ও কীটনাশকসহ সবকিছুর দাম বেড়েছে। অথচ উৎপাদনের পর বাজারে সঠিক দাম না পেলে কৃষককেই সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়তে হয়।

গোয়ালন্দ বাজারের বিসিআইসি ডিলার খন্দকার ফারুক হোসেন বলেন, চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ কম পাওয়ায় সার সরবরাহে সমস্যা হচ্ছে। চলতি মাসে তার চাহিদা ছিল ১০ হাজার বস্তা সার, কিন্তু বরাদ্দ পেয়েছেন মাত্র ৯০০ বস্তা। কৃষকের চাহিদা অনুযায়ী বরাদ্দ বাড়ানো গেলে সরবরাহের চাপ কমবে বলেও তিনি মনে করেন।

তবে সার সংকটের অভিযোগের বিষয়ে ভিন্নমত জানিয়েছেন গোয়ালন্দ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সৈয়দ রায়হানুল হায়দার। তিনি বলেন, উপজেলায় পর্যাপ্ত সার মজুদ রয়েছে। তবে কৃষকরা অনেক সময় অপরিকল্পিতভাবে সার ব্যবহার করায় সাময়িক ঘাটতি তৈরি হচ্ছে।

কৃষি কর্মকর্তা জানান, এবার গোয়ালন্দ উপজেলায় ১ হাজার ৫৯ হেক্টর জমিতে মুড়িকাঁটা পেঁয়াজ আবাদ হচ্ছে। লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী আবাদ চলছে এবং এবারও লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হবে বলে আশা করছেন তারা। কৃষকদের সারের সঠিক ব্যবহার সম্পর্কে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, ফসলের চাহিদা অনুযায়ী সার প্রয়োগ করলে অপচয় কমবে এবং সারের ওপর চাপও কমবে।

কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গোয়ালন্দের দৌলতদিয়া, উজানচর ও দেবগ্রাম ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকায় আগাম মুড়িকাঁটা পেঁয়াজের আবাদ হয়। অন্যান্য ফসলের তুলনায় আগাম পেঁয়াজ বাজারে তুলনামূলক ভালো দাম পাওয়ার সম্ভাবনা থাকায় এ আবাদে কৃষকদের আগ্রহ বেশি।

তবে কৃষকদের ভাষ্য, শুধু আবাদ বাড়ালেই হবে না, উৎপাদন খরচ কমানো এবং পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করাও জরুরি। সার, বীজ, কীটনাশক ও শ্রমিকের মজুরি বাড়তে থাকলে উৎপাদন খরচও বাড়বে। বাজারে কাঙ্ক্ষিত দাম না পেলে আগাম পেঁয়াজ চাষ করেও লাভের পরিবর্তে লোকসান গুনতে হতে পারে।

এদিকে সার সংকট নিয়ে কৃষক ও ডিলারের অভিযোগের বিপরীতে কৃষি বিভাগের পর্যাপ্ত মজুদের দাবি পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে। ডিলারের দাবি, চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ কম; অন্যদিকে কৃষি বিভাগের বক্তব্য, উপজেলায় পর্যাপ্ত সার রয়েছে। ফলে সরবরাহব্যবস্থার কোথায় ঘাটতি তৈরি হচ্ছে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।

কৃষকদের দাবি, সার সরবরাহে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে নির্ধারিত মূল্যে প্রয়োজনীয় সার, বীজ ও কীটনাশক সরবরাহ করতে হবে। পাশাপাশি পেঁয়াজ ওঠার মৌসুমে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমিয়ে উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে হবে। তাদের মতে, উৎপাদন খরচের চাপ কমানো এবং বাজারে ন্যায্য দাম নিশ্চিত করা না গেলে আগাম মুড়িকাঁটা পেঁয়াজের আবাদ বাড়িয়েও কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া কঠিন হবে।