প্রচ্ছদ / আন্তর্জাতিক

আন্তর্জাতিক

যুদ্ধের ঝুঁকিতে সৌদি আরবের অর্থনৈতিক রূপান্তর, ভিশন ২০৩০ কতটা চ্যালেঞ্জের মুখে?

যুদ্ধের ঝুঁকিতে সৌদি আরবের অর্থনৈতিক রূপান্তর, ভিশন ২০৩০ কতটা চ্যালেঞ্জের মুখে?

তেলনির্ভর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে এসে পর্যটন, প্রযুক্তি, বিনোদন, শিল্প ও আন্তর্জাতিক ব্যবসার বৈশ্বিক কেন্দ্র হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে চায় সৌদি আরব। দেশটির যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের নেতৃত্বে নেওয়া ‘ভিশন ২০৩০’ কর্মসূচির মূল লক্ষ্যই অর্থনীতিতে বৈচিত্র্য আনা এবং তেলের ওপর নির্ভরতা কমানো। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত ও সৌদি ভূখণ্ডে সাম্প্রতিক হামলা এই রূপান্তর পরিকল্পনার সামনে নতুন নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রকাশিত বিশ্লেষণ অনুযায়ী, রিয়াদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রাণঘাতী হামলা এবং সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ঘিরে নিরাপত্তা উদ্বেগ দেশটিকে বিদেশি বিনিয়োগের নিরাপদ গন্তব্য হিসেবে প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। হামলাগুলো দেশটির অর্থনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার জন্যও উদ্বেগ তৈরি করেছে।

লনির্ভরতা কমানোর বড় পরিকল্পনা

২০১৬ সালে চালু হওয়া ভিশন ২০৩০-এর মাধ্যমে সৌদি আরব অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়। পর্যটন, বিনোদন, লজিস্টিকস, খনিজ সম্পদ, উৎপাদনশিল্প, প্রযুক্তি ও আর্থিক সেবাকে প্রবৃদ্ধির নতুন চালিকাশক্তি হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হয়।

দেশটি আন্তর্জাতিক পর্যটক আকর্ষণ, বড় ক্রীড়া প্রতিযোগিতা আয়োজন, নতুন শহর ও অবকাঠামো নির্মাণ এবং বিদেশি কোম্পানির জন্য বিনিয়োগের পরিবেশ সম্প্রসারণে বিপুল অর্থ ব্যয় করছে। ২০৩০ সালে এক্সপো এবং ২০৩৪ সালে ফিফা বিশ্বকাপ আয়োজনের প্রস্তুতিও এই বৃহত্তর অর্থনৈতিক রূপান্তরের অংশ।

ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের ২০২৬ সালের জুলাইয়ে প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ভিশন ২০৩০-এর প্রথম দশকে সৌদি অর্থনীতিতে বৈচিত্র্য এসেছে। তবে তেল এখনো দেশটির রপ্তানি আয় ও সরকারি রাজস্বের প্রধান উৎসগুলোর একটি। ফলে নতুন খাতের সম্প্রসারণ সত্ত্বেও অর্থনীতিকে তেলের প্রভাব থেকে পুরোপুরি মুক্ত করা সম্ভব হয়নি।

নিরাপত্তা সংকট কেন অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় চাপ তৈরি করছে?

আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা কোনো দেশে অর্থ বিনিয়োগের আগে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, অবকাঠামোর নিরাপত্তা, যোগাযোগব্যবস্থা এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক সম্ভাবনা বিবেচনা করেন। এসব ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা বাড়লে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত পিছিয়ে যেতে পারে কিংবা বিনিয়োগকারীরা বেশি মুনাফার নিশ্চয়তা চাইতে পারেন।

রিয়াদের বিমানবন্দর এবং সৌদি আরামকোর গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ঘিরে সাম্প্রতিক নিরাপত্তা উদ্বেগ তাই কেবল সামরিক বিষয় নয়, এর অর্থনৈতিক তাৎপর্যও রয়েছে। সৌদি আরব যদি আন্তর্জাতিক ব্যবসা, পর্যটন, সম্মেলন ও বৈশ্বিক যোগাযোগের কেন্দ্র হতে চায়, তবে দেশটির নিরাপত্তা নিয়ে আস্থা ধরে রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ফরচুনের ১৪ অক্টোবর প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আঞ্চলিক সংঘাতের কারণে সৌদি আরবে বিনিয়োগের ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত বিলম্বিত হওয়া, প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি এবং সরকারি অর্থায়নের ওপর নির্ভরতা বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে পরিস্থিতি কতটা দীর্ঘায়িত হয়, তার ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব অনেকাংশে নির্ভর করবে।

বিদেশি বিনিয়োগের লক্ষ্যে বড় ব্যবধান

ভিশন ২০৩০ বাস্তবায়নে সৌদি আরবের অন্যতম লক্ষ্য বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ বাড়ানো। দেশটি ২০৩০ সালের মধ্যে বছরে ১০০ বিলিয়ন ডলার বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।

কিন্তু রয়টার্সের বিশ্লেষণে জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়নবিষয়ক তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে সৌদি আরবে নিট বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগের পরিমাণ ছিলো প্রায় ৩৩ বিলিয়ন ডলার- যা নির্ধারিত লক্ষ্যের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ।

বিদেশি বিনিয়োগ শুধু নতুন অর্থ সরবরাহ করে না, এর সঙ্গে প্রযুক্তি, দক্ষতা, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশাধিকার এবং বেসরকারি খাতে কর্মসংস্থানের সুযোগও আসে। বিনিয়োগের গতি প্রত্যাশার তুলনায় কম থাকলে এসব খাতের বিকাশে সরকারি তহবিলের ওপর বেশি নির্ভর করতে হতে পারে।

বাড়ছে বাজেটের চাপ

সৌদি আরবের অর্থনৈতিক রূপান্তরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ সরকারি ব্যয় ও রাজস্বের ভারসাম্য। বড় অবকাঠামো প্রকল্প, নতুন শিল্প গড়ে তোলা এবং পর্যটন খাত সম্প্রসারণে বিপুল অর্থ প্রয়োজন। একই সঙ্গে তেলের বাজারে অস্থিরতা বা আঞ্চলিক সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে সরকারি অর্থায়নেও চাপ বাড়তে পারে।

ফরচুনের ১৪ অক্টোবরের প্রতিবেদনে সৌদি অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে দেশটির বাজেট ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১৬০ বিলিয়ন সৌদি রিয়ালে, যা আগের বছরের একই সময়ের ৯৩ বিলিয়ন রিয়ালের তুলনায় বেশি। একই প্রতিবেদনে ২০২৬ সালের সম্ভাব্য বাজেট ঘাটতির প্রাক্কলন বাড়িয়ে ২৪৫ বিলিয়ন রিয়াল করার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে সৌদি সরকারকে উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয়, আর্থিক স্থিতিশীলতা এবং ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে। প্রকল্পের অগ্রাধিকার নির্ধারণ, বিনিয়োগের কার্যকারিতা যাচাই এবং বেসরকারি অর্থায়ন বাড়ানো তাই আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

ভিশন ২০৩০ কি থমকে যেতে পারে?

সৌদি আরবের হাতে বড় আর্থিক সম্পদ, রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ তহবিল এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পে অর্থায়নের সক্ষমতা রয়েছে। ফলে সাময়িক নিরাপত্তা সংকটের মধ্যেও সরকার গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প চালিয়ে যেতে পারে। তবে বেসরকারি ও বিদেশি বিনিয়োগের অংশগ্রহণ দুর্বল হলে প্রকল্প বাস্তবায়নের ব্যয় এবং সরকারি অর্থের ওপর চাপ বাড়ার আশঙ্কা থাকবে।

সিএসআইএসের বিশ্লেষণেও বলা হয়েছে, ভিশন ২০৩০-এর পরবর্তী পর্যায়ে শুধু বড় প্রকল্প নির্মাণ নয়, বিনিয়োগের কার্যকারিতা, উৎপাদনশীলতা এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সুফল নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ হবে।

অর্থাৎ, সৌদি আরবের সামনে এখন দুটি কাজ, একদিকে নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক আস্থা বজায় রাখা, অন্যদিকে অর্থনীতিকে তেলনির্ভরতা থেকে বের করে আনার সংস্কার অব্যাহত রাখা।

সামনে কী হতে পারে?

সৌদি আরবের অর্থনৈতিক রূপান্তরের ভবিষ্যৎ অনেকাংশে নির্ভর করবে আঞ্চলিক সংঘাত কত দিন স্থায়ী হয়, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত করা যায় এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা কত দ্রুত ফিরে আসে তার ওপর।

সংঘাত দ্রুত নিয়ন্ত্রণে এলে সৌদি আরব তার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় গতি ফেরানোর সুযোগ পেতে পারে। বিপরীতে, হামলা ও অনিশ্চয়তা অব্যাহত থাকলে পর্যটন, বিমান চলাচল, আন্তর্জাতিক সম্মেলন এবং বিনিয়োগের সিদ্ধান্তে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

সব মিলিয়ে, ভিশন ২০৩০ এখন শুধু অর্থনৈতিক আধুনিকায়নের কর্মসূচি নয়, এটি আঞ্চলিক অস্থিরতার মধ্যে সৌদি আরবের অর্থনৈতিক স্থিতিস্থাপকতারও পরীক্ষা। তেলের আয়কে কাজে লাগিয়ে নতুন অর্থনৈতিক ভিত্তি গড়ে তোলার পরিকল্পনা কতটা সফল হবে, তা নির্ধারণে নিরাপত্তা, বিনিয়োগকারীদের আস্থা এবং সরকারি ব্যয়ের কার্যকারিতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।