আন্তর্জাতিক
সমুদ্র ঠান্ডা হলেও গলতে থাকবে ‘ডুমসডে গ্লেসিয়ার’: গবেষণা

সমুদ্রের তাপমাত্রা কমে গেলেও অ্যান্টার্কটিকার থোয়াইটস হিমবাহের বরফ গলা পুরোপুরি থামবে না। নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, সমুদ্রের কারণে বরফ গলার প্রভাব পুরোপুরি বন্ধ ধরে কম্পিউটার মডেল চালানোর পরও হিমবাহটি আগামী ১৫০ বছর ধরে বরফ হারাতে পারে। বিজ্ঞানীদের মতে, অতীতে সমুদ্রের উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে হিমবাহটির যে পরিবর্তন শুরু হয়েছে, তার প্রভাব দীর্ঘদিন অব্যাহত থাকতে পারে।
বুধবার (১৩ অক্টোবর) ব্রিটিশ অ্যান্টার্কটিক সার্ভিসের প্রকাশিত গবেষণাসংক্রান্ত তথ্যে এ বিষয়টি উঠে এসেছে। গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে বৈজ্ঞানিক সাময়িকী জিওফিজিক্যাল রিসার্চ লেটার্স-এ।
পশ্চিম অ্যান্টার্কটিকায় অবস্থিত থোয়াইটস হিমবাহকে প্রায়ই ‘ডুমসডে গ্লেসিয়ার’ বা ‘বিচারদিবসের হিমবাহ’ বলা হয়। হিমবাহটির বড় ধরনের পতন বৈশ্বিক সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারে বলে বিজ্ঞানীদের উদ্বেগ রয়েছে।
সমুদ্রের প্রভাব বন্ধ করেও কেন কমছে বরফ?
গবেষণায় বিজ্ঞানীরা থোয়াইটস ও পাশের পাইন আইল্যান্ড হিমবাহের ভবিষ্যৎ পরিবর্তন বিশ্লেষণ করতে তিনটি পৃথক কম্পিউটার মডেল ব্যবহার করেন। পরীক্ষার বিশেষ দিক ছিল, মডেলে হিমবাহের ভাসমান বরফস্তরের নিচে সমুদ্রের পানির কারণে বরফ গলার প্রভাব বন্ধ করে দেওয়া হয়।
এমন পরিস্থিতিতে পাইন আইল্যান্ড হিমবাহের বরফের পরিমাণ বাড়তে শুরু করে এবং সেটি আগের অবস্থানের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে। কিন্তু থোয়াইটস হিমবাহ পুরো ১৫০ বছরের সিমুলেশনজুড়েই বরফ হারাতে থাকে। অবশ্য সময়ের সঙ্গে হিমবাহটি পাতলা হওয়ার কারণে বরফ হারানোর গতি কমে আসে।
গবেষকদের মতে, এর অর্থ হলো- থোয়াইটস হিমবাহের ক্ষেত্রে অতীতের পরিবর্তনের প্রভাব এতটাই গভীর যে শুধু সমুদ্র ঠান্ডা করলেই বরফ হারানো বন্ধ করা সম্ভব হবে না।
কয়েক দশক আগেই শুরু হয়েছিল পিছু হটা
গবেষণার সহলেখক ও ব্রিটিশ অ্যান্টার্কটিক সার্ভিসের সমুদ্রবিষয়ক গবেষক পল হল্যান্ডের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, নথিতে দেখা যায়, এই অঞ্চলের হিমবাহগুলোর পিছু হটা ১৯৪০-এর দশকেই শুরু হয়েছিল। এরপর থেকে সমুদ্রের ক্রমবর্ধমান উষ্ণতা বরফ হারানোর অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে উঠেছে।
গবেষণার প্রধান লেখক ও হিমবাহবিজ্ঞানী রোজি উইলিয়ামসের মতে, অতীতে সমুদ্রের কারণে বরফ গলার যে পরিবর্তন ঘটেছে, তার ফলে থোয়াইটস হিমবাহের ভবিষ্যৎ বরফ ক্ষয়ের একটি অংশ এখন কার্যত অনিবার্য হয়ে উঠেছে।
তবে গবেষণায় ব্যবহৃত সমুদ্রের কারণে বরফ গলার প্রভাব সম্পূর্ণ বন্ধ রাখার পরিস্থিতি বাস্তবে ঘটবে না। সমুদ্রের পানি হিমবাহের বরফের সংস্পর্শে থাকলে কিছু মাত্রায় গলন চলতে পারে। ফলে ভবিষ্যতে সমুদ্রের উষ্ণতা বাড়লে হিমবাহটির বরফ ক্ষয় আরও তীব্র হতে পারে।
সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ঝুঁকি
গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, থোয়াইটস হিমবাহ পুরোপুরি ধসে পড়লে বৈশ্বিক সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা আনুমানিক ৬৫ সেন্টিমিটার বাড়তে পারে। তবে এর অর্থ এই নয় যে আগামী ১৫০ বছরের মধ্যে হিমবাহটি নিশ্চিতভাবে পুরোপুরি ধসে পড়বে। গবেষণাটি মূলত দেখিয়েছে, সমুদ্রের কারণে গলন বন্ধ ধরে নিলেও হিমবাহটির বরফ ক্ষয় অব্যাহত থাকতে পারে।
সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পেলে নিচু উপকূলীয় অঞ্চলগুলোতে বন্যা, ভূমিক্ষয় ও লবণাক্ততার ঝুঁকি বাড়তে পারে। বাংলাদেশের মতো বদ্বীপপ্রধান দেশের জন্য বৈশ্বিক সমুদ্রপৃষ্ঠের পরিবর্তন তাই দীর্ঘমেয়াদি উদ্বেগের বিষয়।
গবেষকদের মতে, গ্রিনহাউস গ্যাসের নির্গমন কমানো এবং সমুদ্রের উষ্ণতা বৃদ্ধির গতি নিয়ন্ত্রণ করা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ অতীতের পরিবর্তনের প্রভাব পুরোপুরি এড়ানো সম্ভব না হলেও ভবিষ্যতে অতিরিক্ত বরফ ক্ষয়ের ঝুঁকি কমানোর সুযোগ রয়েছে।
সূত্র: ব্রিটিশ অ্যান্টার্কটিক সার্ভিস; জিওফিজিক্যাল রিসার্চ লেটার্স। গবেষণাপত্রের শিরোনাম: ‘মাস লস ফ্রম থোয়াইটস গ্লেসিয়ার কন্টিনিউজ ইভেন উইদাউট ওশান মেল্টিং’
