আন্তর্জাতিক
ইউরোপে গ্যাসের দাম প্রায় ১৪০ শতাংশ বেড়েছে, চাপে শিল্প ও পরিবার

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্নের কারণে ইউরোপে প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম ব্যাপকভাবে বেড়েছে। শীতের আগে গ্যাসের মজুতও প্রত্যাশার তুলনায় কম থাকায় নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এতে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের উৎপাদন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি সাধারণ পরিবারের জ্বালানি বিলেও চাপ বাড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সংঘাতের প্রভাবে বিশ্ববাজারে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। এর সঙ্গে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়ে অনিশ্চয়তা যুক্ত হওয়ায় ইউরোপকে বিকল্প উৎস থেকে গ্যাস সংগ্রহের জন্য বেশি প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছে।
ফিন্যানশিয়াল টাইমসের ১৪ অক্টোবর প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউরোপের প্রধান গ্যাস বেঞ্চমার্কের দাম প্রতি মেগাওয়াট-ঘণ্টায় ৮৭ দশমিক ২০ ইউরোতে পৌঁছেছে, যা প্রায় চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। যুদ্ধ শুরুর আগে দাম ছিল প্রায় ৩২ ইউরো। অর্থাৎ ওই সময়ের তুলনায় দাম বেড়েছে প্রায় ১৭২ শতাংশ।
অন্যদিকে, ৮ অক্টোবরের ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় ইউরোপের গ্যাসের দাম প্রায় ১৪৭ শতাংশ বেড়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। ফলে নির্দিষ্ট সময় ও বাজারভেদে বৃদ্ধির হার আলাদা হলেও পাইকারি বাজারে জ্বালানির ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
হরমুজ প্রণালিতে সংকট, সরবরাহে অনিশ্চয়তা
বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে আন্তর্জাতিক তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের উল্লেখযোগ্য অংশ পরিবহন করা হয়। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে এই পথে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে গ্যাস সরবরাহে চাপ তৈরি হয়েছে।
ইউরোপের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়েছে এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে একই সরবরাহের জন্য প্রতিযোগিতা বাড়ায়। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও নাইজেরিয়ার মতো দেশ থেকে রপ্তানি বাড়লেও মধ্যপ্রাচ্যের সরবরাহে ঘাটতি পুরোপুরি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের ১২ অক্টোবরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউরোপে গ্যাসের দাম চলতি বছরে ১৫০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত শেষ হলেও কমে যাওয়া মজুত পুনরায় পূরণ করতে সময় লাগতে পারে। ফলে উচ্চমূল্যের চাপ আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
শীতের আগে গ্যাসের মজুত নিয়ে উদ্বেগ
শীতকালে ঘর গরম রাখা, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্পকারখানা চালাতে ইউরোপে গ্যাসের চাহিদা বাড়ে। কিন্তু চলতি বছর শীতের প্রস্তুতির সময় গ্যাসের মজুত তুলনামূলক কম থাকায় সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের ১৪ অক্টোবরের প্রতিবেদনে ইউরোপীয় ইউনিয়নের গ্যাস মজুত প্রায় ৭৩ শতাংশ পূর্ণ থাকার কথা বলা হয়েছে। একই সময়ে সাধারণত মজুত আরও বেশি থাকে। ফলে শীত তীব্র হলে কিংবা গ্যাস সরবরাহে নতুন বিঘ্ন দেখা দিলে বাজারে দাম আরও বাড়তে পারে।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, ইউরোপকে একদিকে শীতের চাহিদা মেটাতে হবে, অন্যদিকে পরবর্তী মৌসুমের জন্য মজুতও পুনর্গঠন করতে হবে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে গ্যাস কেনার প্রতিযোগিতা আরও বাড়তে পারে।
শিল্পকারখানায় বাড়ছে ব্যয়ের ঝুঁকি
গ্যাস ইউরোপের বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিভিন্ন শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি। এর দাম বাড়লে রাসায়নিক, সার, ধাতু ও অন্যান্য জ্বালানিনির্ভর শিল্পে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায়। এতে পণ্যের দাম বাড়ানো, উৎপাদন কমানো কিংবা বিনিয়োগ স্থগিত করার মতো সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে প্রতিষ্ঠানগুলোকে।
উৎপাদন ব্যয় দীর্ঘদিন বেশি থাকলে ইউরোপের শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার সক্ষমতাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বিশেষ করে যেসব প্রতিষ্ঠান বেশি পরিমাণ গ্যাস ব্যবহার করে, তাদের ওপর চাপ তুলনামূলক বেশি পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
পরিবারের জ্বালানি বিলেও চাপ
পাইকারি বাজারে গ্যাসের দাম বাড়লেও সাধারণ পরিবারের বিল একই হারে সঙ্গে সঙ্গে বাড়ে না। আগাম ক্রয়চুক্তি, মূল্য নির্ধারণের নিয়ম এবং সরকারি সহায়তার কারণে খুচরা বাজারে এর প্রভাব পড়তে সময় লাগে।
ইউরোনিউজের ১৪ অক্টোবর প্রকাশিত বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ২ ফেব্রুয়ারি থেকে ১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাজধানীগুলোতে করসহ আবাসিক গ্যাসের দাম গড়ে ১২ শতাংশ বেড়েছে। একই সময়ে বিদ্যুতের দাম বেড়েছে ৪ দশমিক ২ শতাংশ।
অর্থাৎ পাইকারি বাজারে গ্যাসের দাম যতটা বেড়েছে, পরিবারের পর্যায়ে তার প্রভাব এখন পর্যন্ত তুলনামূলক কম। তবে নতুন সরবরাহচুক্তি ও শীতকালীন চাহিদার কারণে আগামী মাসগুলোতে গ্রাহকদের ব্যয় আরও বাড়তে পারে।
সব মিলিয়ে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, সরবরাহের অনিশ্চয়তা এবং কম গ্যাস মজুত ইউরোপের জ্বালানি বাজারকে চাপের মধ্যে রেখেছে। পরিস্থিতির উন্নতি না হলে শিল্পের উৎপাদন ব্যয় ও পরিবারের জ্বালানি বিল, দুই ক্ষেত্রেই উচ্চমূল্যের প্রভাব দীর্ঘায়িত হতে পারে।
সূত্র: রয়টার্স, ফিন্যানশিয়াল টাইমস, ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল ও ইউরোনিউজ
