শিক্ষা
নিউজিল্যান্ডে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের ৭০ শতাংশের ভিসা প্রত্যাখ্যান, কারণ কী?

নিউজিল্যান্ডে পড়তে যেতে আগ্রহী বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য উদ্বেগজনক তথ্য সামনে এসেছে। ২০২৬ সালের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর, এই তিন মাসে বাংলাদেশি আবেদনকারীদের প্রায় ৭০ শতাংশের শিক্ষার্থী ভিসার আবেদন প্রত্যাখ্যান করেছে দেশটির অভিবাসন কর্তৃপক্ষ। জাল ও বিভ্রান্তিকর আর্থিক নথি শনাক্ত করতে বাড়তি যাচাই-বাছাইয়ের কারণে ভিসা প্রত্যাখ্যানের হার বেড়েছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
১৫ অক্টোবর রেডিও নিউজিল্যান্ডের (আরএনজেড) এক প্রতিবেদনে এ তথ্য প্রকাশ করা হয়। একই সময়ে ভারতীয় আবেদনকারীদের প্রায় ৩৯ শতাংশের আবেদনও প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে।
তিন মাসে বেড়েছে ভিসা প্রত্যাখ্যান
প্রতিবেদন অনুযায়ী, জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে বিভিন্ন দেশের পূর্ণ টিউশন ফি প্রদানকারী শিক্ষার্থীদের মোট ৬ হাজার ২৭৩টি ভিসার আবেদন প্রত্যাখ্যান করেছে নিউজিল্যান্ডের অভিবাসন কর্তৃপক্ষ। ২০২৫–২৬ অর্থবছরের পুরো ১২ মাসে প্রত্যাখ্যাত আবেদনের সংখ্যা ছিল ৭ হাজার ৫০৩টি।
এ সময়ে পূর্ণ ফি প্রদানকারী বিদেশি শিক্ষার্থীদের ভিসা প্রত্যাখ্যানের সামগ্রিক হার বেড়ে ৩৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। আগের অর্থবছরে এ হার ছিল ১৩ শতাংশ।
কেন বাড়ছে প্রত্যাখ্যান?
নিউজিল্যান্ডের অভিবাসন কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, শিক্ষার্থী ভিসার আবেদনে জালিয়াতির ধরন আরও জটিল হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে মাস্টার্স পর্যায়ে পড়তে আগ্রহী শিক্ষার্থীদের কিছু আবেদনে আর্থিক সক্ষমতার প্রমাণপত্র নিয়ে সন্দেহ তৈরি হওয়ায় যাচাই জোরদার করা হয়েছে।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, কিছু ক্ষেত্রে আসল নথি পরিবর্তন করে, পুনর্ব্যবহার করে অথবা একাধিক আবেদনে একই আর্থিক নথি ব্যবহার করে আবেদনকে বৈধ হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা শনাক্ত হয়েছে। এ ধরনের অনিয়ম শুধু বাংলাদেশেই সীমাবদ্ধ নয়- ভারত, নেপাল, নাইজেরিয়া ও চীনের আবেদনেও জালিয়াতি কিংবা ভুল ও বিভ্রান্তিকর তথ্য পাওয়া গেছে।
প্রতিবেদনে কয়েকজন অভিবাসন পরামর্শকের বক্তব্যও তুলে ধরা হয়েছে। তাঁদের অভিযোগ, কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভিত্তিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান উপ-এজেন্টের মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক আবেদন তৈরি করছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এসব আবেদনে ভুল বা জাল আর্থিক নথি জমা পড়ছে। ফলে কর্তৃপক্ষের কঠোর যাচাইয়ের প্রভাব প্রকৃত শিক্ষার্থীদের ওপরও পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তাঁরা।
প্রকৃত শিক্ষার্থীদের জন্যও বাড়ছে অনিশ্চয়তা
ভিক্টোরিয়া ইউনিভার্সিটি অব ওয়েলিংটনের আন্তর্জাতিক শিক্ষাবিষয়ক পরিচালক অ্যামি রাদারফোর্ডের বক্তব্য অনুযায়ী, বছরের শুরুর দিকে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের ভিসা অনুমোদনের হার ছিল ৯০ থেকে ১০০ শতাংশের মধ্যে। গত মাসে তা নেমে ২৪ শতাংশে দাঁড়ায়।
তিনি জানান, বিশ্ববিদ্যালয়টিতে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে। তবে ভিসা অনুমোদনের হার এতটা কমে যাওয়ার কারণ তাঁদের কাছেও পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।
এ পরিস্থিতিতে আবেদনকারীদের আর্থিক সক্ষমতার প্রমাণ, অর্থের উৎস, শিক্ষাগত কাগজপত্র এবং অন্যান্য তথ্যের যথার্থতা নিশ্চিত করার গুরুত্ব আরও বেড়েছে।
ভিসার নিয়ম বদলায়নি, বলছে কর্তৃপক্ষ
নিউজিল্যান্ডের অভিবাসন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, শিক্ষার্থী ভিসা মূল্যায়নের নিয়মে পরিবর্তন আনা হয়নি। জাতীয়তা নির্বিশেষে সব আবেদন একই নিয়মে মূল্যায়ন করা হচ্ছে। তবে মাস্টার্স পর্যায়ের কিছু আবেদনে লক্ষ্যভিত্তিক অতিরিক্ত যাচাই কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে, যা সাম্প্রতিক সময়ে প্রত্যাখ্যানের সংখ্যা বাড়িয়েছে।
কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম নয় মাসে বাংলাদেশ থেকে বিদেশে অবস্থানরত শিক্ষার্থীদের ভিসার আবেদন জমা পড়ার সংখ্যার দিক থেকে বাংলাদেশ নিউজিল্যান্ডের তৃতীয় বৃহত্তম উৎসদেশে পরিণত হয়েছে। এ সময়ে বাংলাদেশ থেকে ৩ হাজার ৮৫৮টি আবেদন জমা পড়ে, যা মোট অফশোর আবেদনের প্রায় ৯ শতাংশ।
আবেদন করার আগে কী করবেন?
নিউজিল্যান্ডে উচ্চশিক্ষার পরিকল্পনা করা শিক্ষার্থীদের আবেদনপত্রে সব তথ্য সঠিকভাবে উপস্থাপন করা জরুরি। ব্যাংক স্টেটমেন্ট, অর্থের উৎস, স্পনসরের আর্থিক সক্ষমতার প্রমাণ এবং শিক্ষাগত নথি নিজেরা যাচাই করে নেওয়া উচিত। কোনো এজেন্টের মাধ্যমে আবেদন করলেও জমা দেওয়া নথির সত্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত হতে হবে।
শুধু ভিসা অনুমোদনের নিশ্চয়তা দিয়ে কোনো প্রতিষ্ঠানকে অর্থ দেওয়া কিংবা অন্যের আর্থিক নথি ব্যবহার করা ঝুঁকিপূর্ণ। আবেদন করার আগে নিউজিল্যান্ডের অভিবাসন কর্তৃপক্ষের সরকারি ওয়েবসাইটে সর্বশেষ নির্দেশনা যাচাই করা প্রয়োজন।
সূত্র: রেডিও নিউজিল্যান্ড, ইমিগ্রেশন নিউজিল্যান্ড
আরও পড়ুন- বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য ৬ মাসের কাজের ভিসা চালু করছে নিউজিল্যান্ড
