অর্থনীতি
বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ৩.১ শতাংশের পূর্বাভাস আইএমএফের, বড় ঝুঁকিতে উপসাগরীয় দেশগুলো

চলতি ২০২৬ সালে বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ১ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে বিনিয়োগের শক্তিশালী প্রবণতা বৈশ্বিক অর্থনীতিকে সহায়তা করলেও মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, জ্বালানির উচ্চমূল্য এবং ক্রমবর্ধমান ঋণের চাপ নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে সংস্থাটি।
মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) প্রকাশিত সংস্থাটির সর্বশেষ ‘বিশ্ব অর্থনৈতিক পূর্বাভাস’ প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। এর আগে গত জুলাইয়ে ২০২৬ সালে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৩ শতাংশ নির্ধারণ করেছিল আইএমএফ। নতুন পূর্বাভাসে তা ০ দশমিক ১ শতাংশীয় পয়েন্ট বাড়ানো হয়েছে। তবে ২০২৫ সালে বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ছিল ৩ দশমিক ৫ শতাংশ। অর্থাৎ পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি বছর প্রবৃদ্ধির গতি আগের বছরের তুলনায় কম থাকবে।
২০২৭ সালে বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশে উন্নীত হতে পারে বলে ধারণা করছে সংস্থাটি। তবে এই পূর্বাভাসের বাস্তবায়ন নির্ভর করবে ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি, জ্বালানি সরবরাহ এবং বৈশ্বিক বিনিয়োগের গতিপ্রকৃতির ওপর।
সবচেয়ে বেশি চাপে উপসাগরীয় দেশগুলো
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে জ্বালানি সরবরাহ ও অর্থনৈতিক কার্যক্রমে বিঘ্ন সৃষ্টি হওয়ায় উপসাগরীয় কয়েকটি দেশের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়েছে আইএমএফ। সংস্থাটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে সৌদি আরবের অর্থনীতি ৩ দশমিক ৩ শতাংশ সংকুচিত হতে পারে। গত জুলাইয়ে দেশটির অর্থনীতিতে ১ দশমিক ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল।
এ ছাড়া ইরান, ইরাক, কুয়েত, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের অর্থনীতিতেও সংকোচনের আশঙ্কা রয়েছে। পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি বছর ইরানের অর্থনীতি ৭ দশমিক ৬ শতাংশ, ইরাকের ১৬ শতাংশ, কুয়েতের ১৬ দশমিক ৭ শতাংশ, কাতারের ১৫ দশমিক ৬ শতাংশ এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের ৩ দশমিক ৯ শতাংশ সংকুচিত হতে পারে।
এআই বিনিয়োগে এগিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও এশিয়ার কয়েকটি দেশ
বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি খাতের বিনিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বলে জানিয়েছে আইএমএফ। বিশেষ করে এআই অবকাঠামো নির্মাণ, তথ্যপ্রযুক্তির সরঞ্জাম উৎপাদন এবং সংশ্লিষ্ট সরবরাহব্যবস্থায় বিনিয়োগ কিছু দেশের অর্থনৈতিক কার্যক্রম বাড়াতে সহায়তা করছে।
দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া, মেক্সিকো ও থাইল্যান্ডের মতো দেশ এআই প্রযুক্তির সরঞ্জাম ও সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত থাকায় বাড়তি সুবিধা পাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রেও প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ, ভোক্তা ব্যয় এবং করছাড় অর্থনৈতিক কার্যক্রমকে সহায়তা করছে।
আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ ও ২০২৭—উভয় বছরেই যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি ২ দশমিক ৩ শতাংশ হারে বাড়তে পারে। অন্যদিকে, ভারতের অর্থনীতি চলতি বছর ৭ শতাংশ বাড়তে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
তবে প্রযুক্তি খাতের এই প্রবৃদ্ধির সুফল সব দেশে সমানভাবে পৌঁছাচ্ছে না। সংস্থাটির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির ৯৫ শতাংশের জন্য এখন মাত্র ৩২টি দেশ দায়ী, যেখানে এপ্রিলে এই সংখ্যা ছিল ৫৪। এপ্রিলের পূর্বাভাসের পর থেকে ৪৭ শতাংশ অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়েছে আইএমএফ।
তেলের দাম ও ঋণের চাপ বাড়াচ্ছে ঝুঁকি
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে জ্বালানি ও খাদ্যের দাম আরও বাড়তে পারে বলে সতর্ক করেছে আইএমএফ। সংস্থাটির পূর্বাভাসে ২০২৬ সালে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের গড় দাম ব্যারেলপ্রতি ৯৬ ডলার ধরা হয়েছে। ২০২৭ সালে তা গড়ে ৮৭ ডলারে নেমে আসতে পারে বলে ধারণা করা হয়েছে।
তবে সংঘাত আরও তীব্র হয়ে তেলের দাম ২০২৭ সালের প্রথম প্রান্তিক পর্যন্ত ব্যারেলপ্রতি ১৩০ ডলারে থাকলে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি আরও কমে যেতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে ২০২৬ সালের প্রবৃদ্ধি পূর্বাভাস থেকে ০ দশমিক ২ শতাংশীয় পয়েন্ট এবং ২০২৭ সালের প্রবৃদ্ধি ০ দশমিক ৫ শতাংশীয় পয়েন্ট কমতে পারে।
একই পরিস্থিতিতে ২০২৭ সালে বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি আরও ১ দশমিক ১ শতাংশীয় পয়েন্ট বেড়ে ৫ দশমিক ২ শতাংশে পৌঁছাতে পারে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
এ ছাড়া সরকারি ও বেসরকারি ঋণের উচ্চমাত্রা, সুদের হার বৃদ্ধি এবং এআই খাতে বিনিয়োগ থেকে প্রত্যাশিত মুনাফা না আসার ঝুঁকিও রয়েছে। প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগের প্রত্যাশা ভেঙে পড়লে শেয়ারবাজারে দরপতন এবং আর্থিক পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য কী অর্থ বহন করে
বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়া এবং জ্বালানির দাম বাড়ার প্রভাব বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতিতেও পড়তে পারে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও গ্যাসের দাম দীর্ঘ সময় বেশি থাকলে দেশের জ্বালানি আমদানি ব্যয় বাড়তে পারে। এর প্রভাব বিদ্যুৎ উৎপাদন, পরিবহন, শিল্পের উৎপাদন ব্যয় এবং পণ্যমূল্যের ওপর পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অন্যদিকে, মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি সংকোচন দেখা দিলে ওই অঞ্চলে কর্মরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থান ও আয় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তবে বাংলাদেশের রেমিট্যান্স, রপ্তানি ও প্রবৃদ্ধির ওপর প্রকৃত প্রভাব নির্ভর করবে সংঘাতের স্থায়িত্ব, জ্বালানির বাজার এবং দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ওপর।
আইএমএফ-এর মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশগুলোর জন্য সরকারি ঋণ নিয়ন্ত্রণ, আর্থিক সক্ষমতা পুনর্গঠন এবং জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার করা জরুরি। একই সঙ্গে খাদ্য ও জ্বালানির উচ্চমূল্যে চাপে থাকা জনগোষ্ঠীর জন্য সহায়তা দিতে হলে তা লক্ষ্যভিত্তিক ও সাময়িক রাখার পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি।
সব মিলিয়ে, বিশ্ব অর্থনীতি এখনো প্রবৃদ্ধির ধারায় থাকলেও দেশগুলোর মধ্যে ব্যবধান বাড়ছে। প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগের সুবিধা পাওয়া অর্থনীতিগুলো তুলনামূলকভাবে এগিয়ে থাকলেও জ্বালানিনির্ভর ও নিম্ন আয়ের দেশগুলোকে বাড়তি চাপ সামলাতে হতে পারে।
