প্রচ্ছদ / অর্থনীতি

অর্থনীতি

টানা ২৩ মাস স্বর্ণ কিনছে চীন, ডলারের ওপর নির্ভরতা কমানোর চেষ্টা

স্বর্ণ বার

ডলারনির্ভরতা কমানো ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তায় নিরাপদ বিনিয়োগের খোঁজে স্বর্ণের দিকে ঝুঁকছে চীন। চলতি বছরের প্রথম আট মাসেই দেশটির স্বর্ণ আমদানি ছাড়িয়েছে গত বছরের পুরো সময়ের হিসাব।

আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম কমলেও মূল্যবান এই ধাতু কেনা অব্যাহত রেখেছে চীন। দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক টানা ২৩ মাস ধরে স্বর্ণ কিনছে। একই সঙ্গে চলতি বছরের প্রথম আট মাসে স্বর্ণ আমদানিতে আগের বছরের পুরো সময়ের রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে দেশটি।

বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের ডলারের ওপর নির্ভরতা কমানো, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে বৈচিত্র্য আনা এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে নিরাপদ সম্পদ ধরে রাখার কৌশল থেকে চীনের এই স্বর্ণ কেনা। দেশটির অর্থনীতিতে দুর্বলতা থাকায় আগামী দিনগুলোতেও স্বর্ণের চাহিদা শক্তিশালী থাকতে পারে বলে ধারণা করছেন তাঁরা।

চীনের বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বরে দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক পিপলস ব্যাংক অব চায়না প্রায় ২৩ টন স্বর্ণ কিনেছে। প্রায় তিন বছরের মধ্যে এটি ছিল এক মাসে তাদের সর্বোচ্চ স্বর্ণ কেনার পরিমাণ। অন্তত ২০১৫ সালের পর এটিই কেন্দ্রীয় ব্যাংকটির সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে স্বর্ণ কেনার ধারাবাহিকতা।

আট মাসেই আমদানিতে নতুন রেকর্ড

চীনের শুল্ক বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম আট মাসে দেশটি ১৫ হাজার ৮৮০ কোটি ডলারের স্বর্ণ আমদানি করেছে। পরিমাণের হিসাবে আমদানি হয়েছে এক হাজার টনের বেশি স্বর্ণ।

২০২৫ সালের পুরো বছরে চীন ৯ হাজার ৬৫০ কোটি ডলারের স্বর্ণ আমদানি করেছিল, যার পরিমাণ ছিল ৮৮৬ টন। অর্থাৎ, চলতি বছরের প্রথম আট মাসেই আমদানির মূল্য ও পরিমাণ- দুই ক্ষেত্রেই আগের বছরের পুরো সময়ের হিসাব ছাড়িয়ে গেছে।

স্টেট স্ট্রিট ইনভেস্টমেন্ট ম্যানেজমেন্টের স্বর্ণবিষয়ক কৌশল বিভাগের প্রধান আকাশ দোশির মতে, চলতি বছরের প্রথম আট মাসে চীনে ভোক্তা পর্যায়ে স্বর্ণ আমদানিও রেকর্ড গড়েছে। দেশটির অভ্যন্তরীণ বাজারে স্বর্ণের দামের বাড়তি প্রিমিয়াম শীতকালীন মৌসুমে চাহিদা আরও বাড়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পাশাপাশি সাধারণ ভোক্তা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানও নিরাপদ সম্পদ হিসেবে স্বর্ণ কিনছে। অনিশ্চিত অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে অনেকে স্বর্ণের গয়না, বার ও কয়েনে বিনিয়োগ করছেন।

কেন স্বর্ণ কিনছে চীন

বিশ্লেষকদের মতে, চীনের স্বর্ণ কেনার পেছনে অন্যতম কারণ ভূরাজনৈতিক ও কৌশলগত। যুক্তরাষ্ট্রের ডলারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে স্বর্ণের অংশ বাড়াতে চায় বেইজিং।

জুলিয়াস বেয়ার গ্রুপের বিশ্লেষক কার্স্টেন মেনকের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের ডলারকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের আশঙ্কা এবং মার্কিন সরকারি বন্ডের ওপর নির্ভরতা কমানোর আকাঙ্ক্ষা চীনের স্বর্ণ কেনার অন্যতম চালিকা শক্তি।

২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার হামলার পর পশ্চিমা দেশগুলো রাশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সম্পদ জব্দ করে। এ ঘটনা দেখিয়েছে, ভূরাজনৈতিক বিরোধের সময় বিদেশে রাখা কোনো দেশের রিজার্ভ ব্যবহারে বিধিনিষেধ আরোপ করা সম্ভব। অন্যদিকে, নিজ দেশের ভল্টে রাখা স্বর্ণের ওপর এ ধরনের বিদেশি নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা তুলনামূলক কঠিন।

যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চীনের হাতে থাকা মার্কিন ট্রেজারি বন্ডের পরিমাণ গত জুলাইয়ে ৬১৮ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে, যা ১৮ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। একই সময়ে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে বৈচিত্র্য আনার প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে বেইজিং।

বিনিয়োগের বিকল্প কমছে চীনে

চীনের সাধারণ বিনিয়োগকারীদের স্বর্ণের দিকে ঝুঁকে পড়ার আরেকটি কারণ দেশটির অর্থনৈতিক পরিস্থিতি। একসময় পরিবারের সম্পদ ধরে রাখার অন্যতম প্রধান মাধ্যম ছিল আবাসন খাত। কিন্তু কয়েক বছর ধরে এই খাতে মন্দা চলায় বাড়ি ও জমিতে বিনিয়োগের আকর্ষণ কমেছে।

অন্যদিকে, দেশটির শেয়ারবাজারেও চাপ রয়েছে। চলতি বছরে চীনের প্রধান শেয়ারবাজার সূচক সিএসআই ৩০০ প্রায় ৮ শতাংশ কমেছে। এর বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রের এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক বেড়েছে প্রায় ১৩ শতাংশ।

ব্যাংক আমানত ও বন্ড থেকেও আগের তুলনায় কম মুনাফা পাওয়া যাচ্ছে। ঋণের চাহিদা দুর্বল থাকায় সুদের হারেও চাপ রয়েছে। চীনের এক বছর মেয়াদি সরকারি বন্ডের সুদের হার কমে প্রায় ১ দশমিক ২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। একই মেয়াদের মার্কিন সরকারি বন্ডের সুদের হার প্রায় ৪ দশমিক ৪৬ শতাংশ।

স্যাক্সো ব্যাংকের পণ্যবাজার কৌশল বিভাগের প্রধান ওলে হ্যানসেনের মতে, পশ্চিমা অনেক বাজারের তুলনায় চীনে স্বর্ণ ধরে রাখার সুযোগব্যয়ও কম। অর্থাৎ, অন্য বিনিয়োগে সম্ভাব্য আয় কম হওয়ায় স্বর্ণের মতো সুদবিহীন সম্পদ ধরে রাখার আকর্ষণ বাড়ছে।

এ ছাড়া দেশের অভ্যন্তরীণ স্বর্ণবাজারকে আরও শক্তিশালী করার পরিকল্পনার অংশ হিসেবেও চীন মজুত বাড়াচ্ছে বলে মনে করেন বিশ্লেষক কার্স্টেন মেনকে। তাঁর হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের আগস্টের শেষ নাগাদ চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রায় ১৯০ টন স্বর্ণ কিনেছে। এর মধ্যে প্রায় ১১০ টন কেনার তথ্য আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি বলে তাঁর ধারণা।

স্বর্ণের দাম কমলেও চাহিদায় ভরসা

চীনের ধারাবাহিক স্বর্ণ কেনা আন্তর্জাতিক বাজারে দাম ধরে রাখতেও ভূমিকা রাখছে। সুদের হার বেশি থাকলে সাধারণত স্বর্ণের মতো সুদবিহীন সম্পদের আকর্ষণ কমে। কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর দীর্ঘমেয়াদি কেনাকাটা বাজারে বাড়তি সমর্থন জোগাচ্ছে।

গত জানুয়ারিতে স্বর্ণের দাম প্রতি আউন্স ৫ হাজার ৫০০ ডলারের ওপরে উঠে রেকর্ড গড়েছিল। পরে সেপ্টেম্বরে দাম ৮ শতাংশের বেশি কমে প্রতি আউন্স প্রায় ৪ হাজার ১৭৬ ডলারে নেমে আসে।

আইএনজি ব্যাংকের পণ্যবাজার কৌশলবিদ ইভা মান্থের মতে, স্বর্ণের দামে কাঠামোগত সমর্থন জোগানোর ক্ষেত্রে চীনের কেনাকাটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য নিয়ে স্বর্ণ কেনে। ফলে খুচরা বিনিয়োগকারীদের তুলনায় দামের ওঠানামায় তাদের সংবেদনশীলতা কম।

আকাশ দোশির পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৭ সালের প্রথম প্রান্তিকের শেষ নাগাদ প্রতি ট্রয় আউন্স স্বর্ণের দাম ৪ হাজার ৭৫০ থেকে ৫ হাজার ৫০০ ডলারে পৌঁছাতে পারে। শক্তিশালী চাহিদা এই মূল্যবৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখবে বলে তাঁর ধারণা।

বিশ্ব স্বর্ণ কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, গত আগস্ট পর্যন্ত চীন বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম স্বর্ণধারী দেশ ছিল। তখন দেশটির স্বর্ণের মজুত ছিল ২ হাজার ৩৮৭ টন, যা যুক্তরাষ্ট্রের মজুতের এক-তৃতীয়াংশেরও কম।

কোন পরিস্থিতিতে কমতে পারে স্বর্ণের চাহিদা

বিশ্লেষকদের মতে, চীনের আবাসন ও শেয়ারবাজারে আস্থা ফিরে এলে স্বর্ণের চাহিদা কমতে পারে। এ ছাড়া ইউয়ানের মূল্য কমে গেলে চীনের অভ্যন্তরীণ বাজারে স্বর্ণের দাম বাড়তে পারে। সুদের হার বাড়লে ব্যাংক আমানতও বিনিয়োগকারীদের কাছে বেশি আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে।

দীর্ঘমেয়াদে আরও বড় পরিবর্তন আসতে পারে যদি বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো রিজার্ভে বৈচিত্র্য আনার আগ্রহ হারায় অথবা ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা কমে যায়। তবে ওলে হ্যানসেনের মতে, আপাতত এ দুই পরিস্থিতির কোনোটিই খুব নিকটবর্তী বলে মনে হচ্ছে না।

চীনের ধারাবাহিক স্বর্ণ কেনা তাই শুধু বিনিয়োগের প্রবণতা নয়; বরং বৈশ্বিক অর্থনীতি, ডলারের আধিপত্য এবং ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে দেশটির দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক কৌশলেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত।

- সিএনবিসি নিউজের প্রতিবেদন অবলম্বনে