খেলাধুলা
বার্সেলোনার আয় ১০৬ কোটি ইউরো, তবু লোকসান কেন?

আয় হাজার কোটি ইউরো ছাড়িয়েছে। স্টেডিয়াম থেকে রাজস্ব বেড়েছে, স্পনসরশিপে এসেছে রেকর্ড অর্থ, আর ক্লাবের পণ্য বিক্রিও নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। তারপরও ২০২৫–২৬ অর্থবছর শেষে ১ কোটি ৮০ লাখ ইউরো নিট লোকসান গুনেছে স্প্যানিশ ফুটবল ক্লাব বার্সেলোনা।
ক্লাবটির প্রকাশিত আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫–২৬ অর্থবছরে বার্সেলোনার নিয়মিত আয় হয়েছে ১০৬ কোটি ইউরো, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ৬ কোটি ৬০ লাখ ইউরো বেশি। একই সময়ে পরিচালন ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০২ কোটি ২০ লাখ ইউরো। দৈনন্দিন ব্যবসায় আয়-ব্যয়ের হিসাবে সামান্য উদ্বৃত্ত থাকলেও বিশেষ হিসাব-সমন্বয় ও করের প্রভাব মিলিয়ে শেষ পর্যন্ত লোকসান হয়েছে।
১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ ক্লাবের সাধারণ সভায় ২০২৫–২৬ অর্থবছরের হিসাব অনুমোদিত হয়। ক্লাব কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, নিয়মিত কার্যক্রমে ইতিবাচক ফল ধরে রাখলেও বিশেষ আর্থিক প্রভাবের কারণে নিট ফল ঋণাত্মক হয়েছে।
আয়ের প্রধান উৎস স্টেডিয়াম ও বাণিজ্যিক ব্যবসা
বার্সেলোনার আয়ের প্রবৃদ্ধিতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে স্পটিফাই ক্যাম্প ন্যু স্টেডিয়ামের কার্যক্রম এবং বাণিজ্যিক ব্যবসা।
২০২৫–২৬ অর্থবছরে স্টেডিয়াম পরিচালনা থেকে আয় হয়েছে ২২ কোটি ৫০ লাখ ইউরো, আগের বছরের ১৭ কোটি ৫০ লাখ ইউরোর তুলনায় ২৯ শতাংশ বেশি। সংস্কারকাজের পর ক্যাম্প ন্যুতে ফেরার ফলে টিকিট বিক্রি, দর্শকসেবা ও সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম থেকে আয় বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে পুরো মৌসুমে স্টেডিয়ামের পূর্ণ সক্ষমতা কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি।
বাণিজ্যিক খাত থেকেও এসেছে উল্লেখযোগ্য আয়। স্পনসরশিপ থেকে আয় হয়েছে ২৬ কোটি ৫০ লাখ ইউরো। অন্যদিকে, ক্লাবের পণ্য, লাইসেন্স ও অনলাইন বিক্রির দায়িত্বে থাকা বার্সা লাইসেন্সিং অ্যান্ড মার্চেন্ডাইজিংয়ের মাধ্যমে আয় হয়েছে ২০ কোটি ৮০ লাখ ইউরো। সব মিলিয়ে বাণিজ্যিক আয় দাঁড়িয়েছে ৫২ কোটি ৭০ লাখ ইউরো, যা আগের বছরের তুলনায় ১১ শতাংশ বেশি।
অর্থাৎ বার্সেলোনার ব্যবসায়িক ভিত্তি বড় হচ্ছে। কিন্তু আয় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্যয়ও বাড়ছে।
ব্যয় বাড়ছে কেন?
২০২৫–২৬ অর্থবছরে বার্সেলোনার পরিচালন ব্যয় আগের বছরের তুলনায় ৬ শতাংশ বেড়ে ১০২ কোটি ২০ লাখ ইউরো হয়েছে। এর বড় অংশজুড়ে রয়েছে খেলোয়াড়দের বেতন, দল পরিচালনা এবং বাণিজ্যিক কার্যক্রমের ব্যয়।
প্রথম দলের খেলোয়াড়দের বেতন ও খেলোয়াড়দের চুক্তিসংক্রান্ত অবচয় মিলিয়ে ক্রীড়া-সংক্রান্ত ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৫৭ কোটি ১০ লাখ ইউরো, আগের বছরের তুলনায় ৭ শতাংশ বেশি। খেলোয়াড়দের চুক্তি নবায়ন ও দলকে প্রতিযোগিতামূলক রাখার ব্যয় এর পেছনে ভূমিকা রেখেছে।
এ ছাড়া ক্রীড়াবহির্ভূত কর্মীদের বেতন বেড়েছে ৯ শতাংশ এবং ব্যবস্থাপনা ব্যয় বেড়েছে ১২ শতাংশ। পণ্য বিক্রি ও বাণিজ্যিক কার্যক্রমের বিস্তারের সঙ্গেও কিছু পরিচালন ব্যয় বেড়েছে।
ফলে আয় বাড়লেও পুরো অর্থ ব্যয় মেটানোর পর বড় মুনাফা অবশিষ্ট থাকেনি।
বার্সা প্রডাকশন্সের মূল্য কমার প্রভাব
বার্সেলোনার নিট লোকসানের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বার্সা প্রডাকশন্সের হিসাবি মূল্য কমানো। এটি ক্লাবের অডিওভিজ্যুয়াল ও ডিজিটাল কনটেন্ট-সংক্রান্ত ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠান।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই প্রতিষ্ঠানের মূল্যায়নে আরও ২ কোটি ৩০ লাখ ইউরোর হিসাবি অবমূল্যায়ন করা হয়েছে। এর ফলে ক্লাবের চূড়ান্ত আর্থিক ফলের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। আর্থিক বিবরণীতে সম্পদের মূল্য কমে গেলে তা লাভ-লোকসানের হিসাবে প্রভাব ফেলতে পারে। বার্সেলোনার ক্ষেত্রে নিয়মিত কার্যক্রমের ফল ইতিবাচক থাকলেও এই ধরনের বিশেষ হিসাব-সমন্বয় নিট ফলকে লোকসানে নিয়ে গেছে।
নিয়মিত হিসাবে সামান্য উদ্বৃত্ত, ইবিটডা ১৪ কোটি ইউরো
বার্সেলোনার আর্থিক চিত্র বুঝতে শুধু নিট লোকসান দেখলে পুরো বিষয়টি স্পষ্ট হয় না। ক্লাবটির নিয়মিত কার্যক্রমে আয়-ব্যয়ের পর উদ্বৃত্ত ছিল প্রায় ২০ লাখ ইউরো। সুদ, কর, অবচয় ও পরিশোধ-পূর্ব আয়, অর্থাৎ ইবিটডা ছিল ১৪ কোটি ইউরো।
এই দুটি সূচকে বুঝা যায়, ক্লাবটির নিয়মিত ব্যবসায় আয় তৈরির সক্ষমতা রয়েছে। তবে ইবিটডা সরাসরি নিট মুনাফা নয়, এতে সুদ, কর ও অবচয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ খরচের প্রভাব পুরোপুরি ধরা পড়ে না। তাই ইবিটডা ইতিবাচক থাকলেও শেষ হিসাবে লোকসান হওয়া সম্ভব।
ঋণের চাপও বড় চ্যালেঞ্জ
বার্সেলোনার আর্থিক পুনরুদ্ধারের পথে ঋণ ও স্টেডিয়াম সংস্কারের অর্থায়ন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে। ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত ক্লাবটির মোট ঋণ ছিল ৯১ কোটি ইউরো। লা লিগার হিসাবপদ্ধতি অনুযায়ী নিট ঋণ দাঁড়িয়েছে ৬০ কোটি ৭০ লাখ ইউরো, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ১৩ কোটি ৮০ লাখ ইউরো বেশি।
এ হিসাবের সঙ্গে ক্যাম্প ন্যু সংস্কার প্রকল্পের জন্য নেওয়া প্রায় ১৫০ কোটি ইউরোর আলাদা অর্থায়নকে এক করে দেখা ঠিক হবে না। প্রকল্পটির অর্থায়ন পৃথক কাঠামোয় সাজানো হয়েছে এবং তা ফেরত দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে ভবিষ্যৎ স্টেডিয়াম-রাজস্ব থেকে। ফলে ক্লাবের নিয়মিত ঋণ, লা লিগার নিয়ন্ত্রক হিসাব এবং স্টেডিয়াম প্রকল্পের অর্থায়ন- এই তিনটি বিষয় আলাদা করে বুঝতে হবে।
তবু স্টেডিয়াম সংস্কারে বিলম্বের কারণে প্রত্যাশিত আয় পিছিয়ে যাওয়া এবং অতিরিক্ত অর্থায়নের প্রয়োজন ক্লাবটির নগদ অর্থ ব্যবস্থাপনায় চাপ সৃষ্টি করছে। সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ বার্সেলোনা ক্যাম্প ন্যু প্রকল্প শেষ করতে আরও ৫১ কোটি ইউরো অর্থায়নের পরিকল্পনা অনুমোদনের কথা জানায়।
পরের মৌসুমে মুনাফার লক্ষ্য
২০২৬–২৭ অর্থবছরের জন্য বার্সেলোনা ১১৯ কোটি ৫০ লাখ ইউরো আয়ের বাজেট করেছে। ক্লাবটির প্রত্যাশা, স্টেডিয়াম থেকে আয় বাড়া, বাণিজ্যিক কার্যক্রমের বিস্তার এবং ব্যয় নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে প্রায় ১০ লাখ ইউরো নিট মুনাফা করা সম্ভব হবে।
তবে এই লক্ষ্য অর্জন নির্ভর করবে স্টেডিয়ামের কার্যক্রম কতটা স্বাভাবিক হয়, বাণিজ্যিক আয় প্রত্যাশামতো বাড়ে কি না এবং খেলোয়াড় ও পরিচালন ব্যয় কতটা নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়- তার ওপর।
সূত্র: এফসি বার্সেলোনার ২০২৫–২৬ অর্থবছরের আর্থিক হিসাব ও ২০২৬–২৭ বাজেট; এল পাইস; ইনফোবে; রয়টার্স
