সাহিত্য
আদমের দুঃখগুলো: কবীর আলমগীরের একাকীত্বের সন্ধানে । উপল বড়ুয়া

বইয়ের নামটাই চমকে দেওয়ার মতো—‘আদমের দুঃখগুলো’। আদম কে, কী ছিল তার দুঃখ—সে তো আমরা সবাই সবই জানি। পৃথিবীর প্রথম পুরুষ তিনি। প্রথম ঝর্ণার মতো প্রথম দুঃখও তাঁর থেকে উৎপত্তি। এরপর বংশবিস্তারের মতোন আদমের একেকটি দুঃখ ছড়িয়েছে পৃথিবীর এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত। বলতে গেলে, আমরা দুঃখের সন্তান। আর সেসব দুঃখ প্রকাশে কবীর আলমগীর বেছে নিলেন আদিপুরুষ আদমকে। আমাদের পিতার দুঃখকে। নির্বাসিত জীবনে দীর্ঘ একাকীত্বের ভেতর আদম পুরো পৃথিবীকে যেভাবে দেখেছেন, কবি ঠিকই সেসব উপলব্ধি করেছেন। কবির ধর্মই এমন। তিনি অতীত ছেঁকে তুলে আনতে পারেন মণি। বর্তমানে করতে পারেন ভবিষ্যতের জন্য মুক্তো চাষ। আকাশ যতদূর, তাঁর স্বপ্ন ও কল্পনার সীমা তার অধিক। আদমের ভেতর দিয়েই কবীর আলমগীর অনুধাবন করে বুঝেছেন, মানুষ মূলত একা। আর কবি তো আরও একা। আদমের ‘বহুবচন রূপে’ আসা দুঃখগুলোর মতোন কবীর আলমগীরের এই অসামান্য কাব্যগ্রন্থও দাঁড়িয়ে আছে একাকিত্বের সাঁকোর ওপর।
শুরুর আগেই বইয়ের উৎসর্গপত্রে চোখ বোলানো যাক। আদমের মতোন সন্তানহারা এক পিতার কণ্ঠস্বরই যেন ভেসে আসে আমাদের কানে। ‘রামিসা’কে নিয়ে লেখা কয়েকটা লাইন। শোকার্ত পিতার নীরব গোঙানি যেন এই কয়েকটা পঙ্ক্তি, ‘তোমার ছোট্ট জুতোগুলো হয়তো/দরজার পাশে চুপচাপ ঘুমিয়ে আছে।’ রামিসা কে, সেটি কারও অজানা নয়। তবু না চিনলে একবার গুগল করে নেবেন। আর বলবো, কারও শিশুরই যেন এমন ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি না হোক।
কবীর আলমগীর নিভৃতচারী কবি। তার ব্যক্তিগত এই চুপচাপ স্বভাবটা বইজুড়ে ফিরে ফিরে আসে। সেটি আমরা দেখি বইয়ের নাম ভূমিকার কবিতা ‘আদমের দুঃখগুলো’তে, ‘আদমের দুঃখগুলো খুব চুপচাপ,/ তোলে না স্লোগান, আর হাঁটে না মিছিলে/বরং সন্ধ্যার মতো ধীরে তার কাঁধে বসে।’
এখানে দুঃখ ‘পাখিদের নীড়ে ফেরা’ একটা সন্ধ্যার মতোন। কাঁধে এসে বসে। কিছু বলে না। এই অ্যাবস্ট্রাক্ট চিত্রকেল্পর ভেতর খুঁজে নিতে হয় অনুভূতিকে। গ্রন্থজুড়ে আরেকটা বিষয় খেয়াল করার ন্যায়। সচেতন হোক বা অবচেতন মনে, কবি বেশ কয়েকটি কবিতায় ‘হাওয়া’ শব্দটিকে বিশেষ উদ্দেশ্যে উল্লেখ করেছেন। সেই হাওয়া কখনো আদমের সঙ্গিনী, কখনো বাতাস হিসেবে এসেছে। কোন হাওয়া, সেটা পাঠক ঠিক করে নেবেন। এই আড়ালটুকু কবির একান্ত। তেমন একটি কবিতা, ‘আদমের সন্তান। কবীর আলমগীর লিখেছেন, ‘কেঁদেছিল হাওয়ার বিরহে, হাওয়ারই পরশে!/ আদমের ছেলে আমি, আদি পিতার মতন,/ দুখের শোকেসে রাখি বিরহের বাসন-কোসন/ বাজে ঝনঝন।/ আমি আদমের মতো।/ হাওয়ার শোকেই, বিরহগুলো হাওয়াতে ওড়াই।’
ঈশ্বর এক ও একা। সেই ঈশ্বরকে কবীর আলমগীর খুঁজেছেন ভাববাদের ভেতর দিয়ে। ‘ঈশ্বর শূন্যতা ছুঁয়ে বেরিয়ে এলেন’ কবিতায় তিনি ঈশ্বরের সেই শূন্যতা ও বিশালত্বকে খোঁজার চেষ্টা করেছেন। এই কবিতায় সৃষ্টির আগের অন্ধকারে দাঁড়িয়ে ঈশ্বর বলেন, ‘আমি একা—আমি একটি পৃথিবী তৈরি করবো।’ মানুষ ও সৃষ্টির ভেতর দিয়ে খুঁজে পাওয়া যায় ঈশ্বরকে। তবে মাঝখানে যেন অপার এক শূন্যতা। এই দুই একাকিত্বের মাঝে দুলছে কবীর আলমগীরের এই কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলো।
এই বইয়ের আরেকটি উল্লেখযোগ্য কবিতা ‘যেভাবে তৈরি হলো মিথ’। কবিতাটি ছোট, কিন্তু তীব্র। শুরুর পঙ্ক্তি এমন, ‘একদা গোত্রের সৃষ্টিকর্তা/ আমাদের সঙ্গে থাকতেন দূরে গভীর জঙ্গলে/ আমরা কাঁচামাংস ভাগাভাগি করে/ নারীর সঙ্গে সঙ্গম করে ঘুমাতাম।/ সৃষ্টিকর্তা ঈর্ষায় জন্ম দিলেন পাপের।’ কবিতার শেষে রয়েছে চমক। সারমর্মটা এমন— মানুষের পাপ দেখে ভয় পান ঈশ্বর, আর জঙ্গল ছেড়ে অদৃশ্য হয়ে যান।
এই কাব্যগ্রন্থের আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, মিথলজিক্যাল ও ধর্মীয় চরিত্রগুলোকে রক্তমাংসের ভেতর দিয়ে উপস্থাপন। শুধু আদম ও হাওয়া নয়। নুহ, ইব্রাহিম, মরিয়মও উঠে এসেছেন কবীর আলমগীরের কবিতায়। কখনো শক্তি, কখনো করুণার বিষয় হিসেবে তাঁরা এসেছেন কবিতায়। ‘নুহের নৌকায়’ সেটিই দেখি, ‘আমরা মরুভূমি থেকে ফিরে এসেছি,/ আমরা গুহা ছেড়ে বেরিয়ে এসেছি,/ আমরা ভয়কে অস্বীকার করে যাত্রা করি।/ আমাদের যাত্রা মৃত্যুর সঙ্গে প্রতিদিন।/ হিমঠাণ্ডা লোহিত সাগর পাড়ি দেই নির্ভীক।/ আমরা আকাঙ্ক্ষা করি/ অন্য এক, নতুন এক প্রভুর।’
‘দাও উপহার’ কবিতায় কবি যেন নিজের মুখোমুখি বসেছেন। কোনো রাখডাক না রেখে সহজ উচ্চার, ‘আমি ফেরেশতা নই, মানুষই আমি।/ আমি নুরের পাত্র নই,/ আমার কলব সাক্ষ্য দেয়-আমি অন্ধকারময়।’ ধর্মীয় গল্প মূলত নীতি শিক্ষার তরে। সেখানে সাধু-সন্ন্যাসী-সন্তের মহিমার বিবরণ থাকে। থাকে চোর, মাতাল, দুরাচার, ঠকবাজ। তবে কবীর আলমগীর এসবের কোনো বিবরণ দেননি। তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন। উপলব্ধি করেছেন। কিন্তু নিজেকে কোথাও বসাননি। আবার কবি ঈশ্বরের সামনে বসে নিজেকে ভেবেছেন ‘পাপী’, বলেছেন ‘নিমকহারাম’। আর সেটা বলেন একজন মানুষের গলায়। এই ভাববাদই মূলত এই কাব্যগ্রন্থের শক্তিশালী দিক।
ঈশ্বর, ধর্ম, মিথের পাশাপাশি এই বইয়ের আরেক গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো রাজনীতির। এই কবিতাগুলোয় গলা একটু চড়া। আছে প্রতিবাদ। ‘হত্যার দিনলিপি’ কবিতায় কবি নিজেকে নিয়েই যেন ভবিষদ্বাণী করেছেন। একদিন তাকে হত্যা করা হবে। তিনি দেখেন, কী কী লুট হচ্ছে। সাহসী কণ্ঠে কবীর আলমগীর লিখেছেন, ‘লুট হচ্ছে গণতন্ত্র, সকালের কোমল শিশির/ লুট হচ্ছে চাঁদরাত—আলোর মিছিল।’
‘বিপ্লবীর বাসনা’য় এসেছে শ্লেষ ও স্যাটায়ার। কমরেড কিভাবে ‘কম রেট’ হয়ে যায়, সেটি নিয়ে নিজের সঙ্গে নিজেই মজা করেছেন। এই শব্দের খেলার ভেতর আছে সত্য উচ্চারণও। কবীর আলমগীর লিখেছেন, ‘আমাদের নাম ছিল লাল কমরেড মধুর ক্যান্টিনে ওয়েটার চিনেছিল ‘কম রেট’/ কখন যে ‘কম রেট’ হয়ে গেছি বুঝতে পারিনি!’ রাজনৈতিক আদর্শ কিভাবে দরদামে নেমে আসে, সেটি এই দুই লাইনেই যেন বলা হয়ে গেছে। ব্যাখ্যা লাগে না।
যুদ্ধ ও অধিকারের কবিতাগুলোও এই বইয়ের আরেকটি অংশ। ‘মানুষ মরছে, ‘জল্লাদ মিসাইল’, ‘মরিয়মের প্রতি’ কবিতাগুলো পড়লে বোঝা যায়, কবি খবরের পাতা থেকে সময়ের দলিল হিসেবে সময়কে নিজের ভাষায় নথিভূক্ত করে রেখেছেন। ‘নদীর নাম বিপুল চাকমা’ কবিতার কথায় বলা যাক। বিপুল ছিলেন পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের (পিসিপি) সাবেক সভাপতি এবং গণতান্ত্রিক যুব ফোরামের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে খাগড়াছড়ির পানছড়িতে দুর্বৃত্তদের গুলিতে ইউপিডিএফের অন্য নেতাকর্মীদের সঙ্গে তিনিও নিহত হন। সেই বিপ্লবী বিপুলকে কবি তুলনা করেছেন ‘বারুদের’ সঙ্গে। বিপুলের ভেতর দিয়েই যেন নিজের অধিকার আদায়ে সোচ্চার কবীর আলমগীর, ‘অধিকার চাই সিনা টানটান করে দাঁড়াবার।/ অধিকার চাই সোনার ফসল ফলাবার।/ অধিকার চাই সোনার ফসল ফলাবার।’
কবি এই কাব্যগ্রন্থে কখনো ভাববাদী, কখনো প্রতিবাদী কণ্ঠস্বরের সম্মিলন ঘটিয়েছেন। তবে ভোলেননি নিজের অতীত ও জন্মদাতাকে। বাবা ও মায়ের প্রতি দরদও স্পষ্ট দেখা যায় কবীর আলমগীরের কবিতায়। ‘যখন আমার মৃত্যু হবে’ কবিতায় কবি নিজের মৃত্যুর কথা ভাবেন। ভাড়াটে অ্যাম্বুলেন্স, শহরের কোলাহল, গ্রামের মাঠ। শেষে এসে সব কিছু থেমে যায় বাবার চোখে। মৃত্যুর সময়ের কথা মনে করে লিখেছেন, ‘সূর্যের সোনালি আলোয় হয়তো তখন/ চিকচিক করে কেঁদে উঠবে আমার/ বাবার চোখে লুকিয়ে থাকা গভীর নদীটি।’
আর ‘বাবার সাইকেল’ পড়তে পড়তে যে কেউ স্মৃতিকাতর হয়ে উঠতে পারেন। মনে পড়ে যেতে পার বাবার মুখ। ছেলেবেলায় দেখা পুরোনো সাইকেল, রঙ ওঠা সেই সাইকেলের যেন এখনই রিং বাজবে টুংটাং শব্দে। এই বুঝি সাইকেলে চড়ে শত দুঃখ কাঁধে নিয়েও হাসিমুখে বাবা ঘরে ফিরছেন, ‘কখনো জানা হয়নি, বাবা তোমার দুঃখ কিসের?/ তোমার সাইকেলের রং মেটো কেন?’ এই প্রশ্ন এত সোজা বলেই হয়তো এত ভারী।
প্রেমের কবিতাতেও কবির সুর চওড়া নয়। ভোরের নরম আলোর মতোন। এক্ষেত্রে বলা যায় ‘দেরি করে ফেলি’ কবিতাটার কথা। যে কথাটা সবচেয়ে জরুরি, সেটাই বলা হয় না, ‘আমি তো সবসময় দেরি করে ফেলি/ যে কথা হৃদয়ে বৈশাখের ঝড় তোলে/ সেই কথা তাড়াতাড়ি বলবো বলবো / ভেবে খুব দেরি করে ফেলি।‘
‘পাহারাদার প্রেম’ কবিতাটিতে আছে চমক, ‘কিছু প্রেম পাহারায় থাক,/ কিছু প্রেম নেচে ওঠে গভীরে।’ এছাড়া ‘জন্মের আগে’ কবিতাটি যেমন গভীর তেমনি পঙ্ক্তিও বেশ চমক জাগানিয়া, ‘প্রেয়সীর ঠোঁটের আগুনে শেষ সিগারেট জ্বালাতে গিয়ে/ ভুল করে জ্বালিয়ে ফেলেছি আমারই রুহ।’
কবীর আলমগীর জানেন কবিতায় কখন থামতে হয়। তার পরিমিতিবোধ ও শব্দের খেলা চমৎকার। আদমের দুঃখগুলো’তে তিনি ভাষা ও শব্দের যে জাল বুনেছেন, তা পাঠককে নিশ্চিত নতুনভাবে ভাবাবে।
