সাহিত্য
লেখাজীবন: সময় অসময় দুঃসময় ।। তুষার গায়েন

।। প্রথম পর্ব: ১ম ভাগ ।।
এই শিরোনামের ভেতর যে অস্তিত্বদর্শন ও অভিজ্ঞানের বীজ সমাহিত আছে, তা লেখকের জীবনসংগ্রাম, লেখকসত্তার ক্রম বিবর্তন—ব্যক্তিগত পরিসর থেকে সমাজ, রাষ্ট্র ও বিশ্ব পরিসরে কীভাবে সম্পৃক্ত, সংরক্ত ও প্রভাবিত হয়ে থাকে, তার হদিশ নিতে বলে। এটা লেখকের নিজস্ব অভিযাত্রাই শুধু নয়, যে কাল পরিসরে তিনি বা তাঁরা বিচরণ করেন, সহযাত্রী লেখকরা কীভাবে সেই কালকে ধারণ ও প্রকাশ করেন— সেসবের সাথে ঐক্য ও বিরোধের ক্ষেত্রগুলো চিহ্নিত করাও জরুরী হয়ে পড়ে। একজন বাংলাভাষী লেখক হিসেবে আমার অনুসন্ধান প্রধানত বাংলাভাষী দেশ ও অঞ্চলসমূহ, বিশেষ করে বাংলাদেশ ভূখণ্ডে বেশি ক্রিয়াশীল হবে, কারণ জন্মসূত্রে আমি একজন বাংলাদেশি নাগরিক। এই অঞ্চলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক কালপর্বে, লেখকদের জীবন ও সৃষ্টিকর্ম কীভাবে প্রভাবিত ও বিবর্তিত হয়েছে, তার একটা খোঁজ নেয়ার চেষ্টা করবো।
শৈশবে আমার বয়স যখন ৪, মুক্তিযুদ্ধের অগ্নিগর্ভকালীন স্মৃতি মনে পড়ে। আমার বাবা তখন যশোরে সরকারী চাকুরে, পাঁচিলঘেরা সবুজ চত্বর এবং উঁচু উঁচু পামগাছের ছায়া-অলিন্দে বাবার অফিস ও অফিসারদের বাসভবন, পুকুরপাড়ে লাল টালি ছাদের একতলা আমাদের বাসা। মনে পড়ে পাঁচিলের ওপাশে রাস্তা দিয়ে চলেছে উত্তাল মিছিল, মুষ্ঠিবদ্ধ হাতে উচ্চকিত শ্লোগান ও দাবিনামা সম্বলিত অজস্র প্ল্যাকার্ড, যার কোনো একটিতে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতার প্রতীক হিসেবে বিদ্ধ এক মৃত ঈগল। যশোর ক্যান্টনমেন্ট খুব দূরে নয়, হঠাৎ হঠাৎ বোমা বিস্ফোরণের শব্দ শুনে আমরা খাটের তলায় ঢুকে পড়ি এবং একদিন পাকবাহিনীর আগমনের পূর্বাভাস পেয়ে সপরিবারের পায়ে হেঁটে রওনা হই পিতৃভূমি, মাদারীপুর জেলার (পূর্বতন ফরিদপুর) অন্তর্গত ফুলবাড়ী গ্রাম। সকালে ভরপেট গরম ফেনাভাত খেয়ে দূরে বিলের জলে নাক ডুবিয়ে পালিয়ে থাকা ও দুপুর গড়ালে ঘরে ফিরে আসা—এভাবে কয়েকদিন কাটলে, একদিন বিলের জল থেকে মাথা তুলতে দেখি দূরে বসতভিটার রেখায় আগুন জ্বলছে দাউ দাউ, ফিরে এসে চোখে পড়ে খানসেনাদের আগুনে আমাদের দোতলা কাঠের বাড়ি ও গ্রামের অন্যান্য শরীকদের বাড়িঘর, ক্ষেত-খামার পুড়ে ছাই—নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে আমরা পায়ে হেঁটে রওনা করি বনগাঁ, পশ্চিমবঙ্গের উদ্দেশে। শৈশবের সেই স্মৃতি কবিতা হয়ে ফিরে আসে বহুকাল পর : 'এখানে তোমার জন্ম, রৌদ্র আর বৃষ্টির কলহে/ অন্তহীন নিসর্গচারিতা,/ সার সার নদীবন্দি জলবিস্ফোরণ/ তোমার মার্বেলগুলো অগ্নিদগ্ধ উঠোনের পথে একতাল কাচ।/ অনুরূপ আসিদ্ধ বেগুন/ কী দীর্ঘ ঘরের খুঁটি পুড়ে যায়/ মানুষ দিয়েছে জ্বেলে মানুষের ঘর/ আড়াআড়ি বাতাসের স্রোতে শুধু এক পদ্ম জায়মান,/ কী জলে কী স্থলে তার গিয়েছে শেকড়/ আর গ্রীবাটুকু হেলে আছে ধ্যানমগ্ন চোখে ... [বোধিপ্রায়, নীলভবহ্রদ, ১৯৯৭] যে সময়ের প্রেক্ষাপটে লিখিত এই কবিতা, তার পূর্বাপর ইতিহাস বাংলাদেশের কাব্য, সাহিত্যের ক্ষেত্রে দিক নির্ণয়কারী।
ব্রিটিশ উপনিবেশের বিরুদ্ধে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে হিন্দু-মুসলিমের সমন্বিত আন্দোলনের পাশাপাশি, জিন্নাহ দ্বি-জাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে মুসলমান সম্প্রদায়ের স্বতন্ত্র আত্মবিকাশের দাবিতে যে ধর্মভিত্তিক জাতি ও রাষ্ট্র-প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে অগ্রসর হন, চল্লিশের দশকে বাঙালি মুসলমানের একটি বড় অংশ একই ভাবধারায় সাহিত্য-সংস্কৃতির চর্চা শুরু করেন। ১৯৪১ সালে সৈয়দ সাজ্জাদ হোসেনকে চেয়্যারম্যান নির্বাচন করে 'পূর্ব পাকিস্তান সাহিত্য সংসদ ও পূর্ব পাকিস্তান রেনেসাঁ সোসাইটি' গঠিত হয়। এই সংগঠনের পক্ষ থেকে আবুল মনসুর আহমদ, সৈয়দ সাজ্জাদ হোসেন, সৈয়দ আলী আহসান প্রমুখ এই অভিমত ব্যক্ত করেন যে তাদের স্বপ্নাদর্শের পাকিস্তানে বাংলাভাষার চরিত্র হবে হিন্দুত্ব বর্জিত। বাংলা ভাষায় মুসলিম কালচারের পরিচয়বাহী সাহিত্য সৃষ্টিতে লেখকদের উদ্বুদ্ধ করা ও বাংলাভাষাকে স্বতন্ত্র রূপ দিতে প্রচুর আরবি-ফার্সি উপাদান আমদানি করা হয়। গোলাম মোস্তফা, ফররুখ আহমদ, রওশন ইয়াজদানী, তালিম হোসেন, মোফাখখারুল ইসলাম, মীজানুর রহমান, শাহেদ আলী প্রমুখ এই ধারায় কাব্য, সাহিত্য রচনায় প্রাণপাত করেন। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর, পূর্ব পাকিস্তানে ধর্মকেন্দ্রিক জাতীয়তাবাদ ও তার নিরিখে শিল্প-সাহিত্য-সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য নির্মাণে তৎপরতা বহুগুণে বৃদ্ধি পায় এবং এর প্রণোদনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবুল কাসেম ইসলামী সাংস্কৃতিক সংগঠন 'তমুদ্দিন মজলিস' প্রতিষ্ঠা করেন।
বাংলার শিল্প-সাহিত্যের প্রায় অবিচ্ছিন্ন ধারাটি দু’ভাগে বিভক্ত হবার উপক্রম হয় এবং পাকিস্তানি ভাবাদর্শে উজ্জীবিত কবি ও সাহিত্যিকগণ জাতিসত্তার প্রাণরস সন্ধান করতে থাকেন সবুজ-শ্যামল বাংলার পরিবর্তে খেজুর-কণ্টকিত দূর মরু-সাহারায়। পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকরা বাঙালি মুসলমানদের বিশুদ্ধ মুসলিম হিসেবে গণ্য করেনি, তাই শুদ্ধি অভিযান শুরু হয় বাংলাভাষার ওপর আঘাত হেনে। বাংলাভাষায় আরবি হরফ প্রবর্তন ও সংস্কৃত শব্দের ব্যবহার কমিয়ে, তার পরিবর্তে আরবি ফারসি উর্দু ইত্যাদি শব্দের ব্যবহার বৃদ্ধি করে 'পাক-বাংলা ভাষা' তৈরীর উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। ১৯৪৮ সালে করাচিতে নিখিল পাকিস্তান শিক্ষা সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী ফজলুর রহমান প্রথম এ প্রস্তাব করেন। অসাম্প্রদায়িক চেতনার বাঙালি শিক্ষক, ছাত্র ও বুদ্ধিজীবীরা এই হীন চক্রান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেন যাদের মধ্যে বহু ভাষাবিদ, জ্ঞানতাপস ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ অন্যতম। ১৯৫০ সালে গণপরিষদে আরবি হরফে বাংলা লেখার প্রস্তাব উপস্থাপিত হলে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত প্রতিবাদ করে বাংলা ভাষাকে পাক-পরিষদের অন্যান্য ভাষার সাথে সমানাধিকার দানের প্রস্তাব উত্থাপন করেন। এর পূর্বে, ১৯৪৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে জিন্নাহ উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দিলে বাঙালি ছাত্ররা এর বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানায়—সূত্রপাত হয় ভাষা আন্দোলনের। পাকিস্তানী ভাবাদর্শের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যায় অসাম্প্রদায়িক বাঙালি চেতনা।
১৯৫১ সালে সৈয়দ আলী আহসান 'পূর্ব পাকিস্তানে বাংলা সাহিত্যের ধারা' প্রবন্ধে লেখেন, 'প্রাক্তন সম্পূর্ণ বাংলার সাহিত্যের ভাণ্ডার কখনও নিঃশেষিত হবে না। সেগুলোর উপর উভয় বাংলারই পূর্ণ অধিকার আছে, কিন্তু এই অধিকার থাকার অর্থ এই নয় যে, এই সাহিত্যের ট্রেডিশনও আমরা গ্রহণ করবো। নতুন রাষ্ট্রের স্থিতির প্রয়োজনে আমরা আমাদের সাহিত্যে নতুন জীবন ও ভাবধারার প্রকাশ খুঁজবো। সে সঙ্গে একথা সত্য যে, আমাদের সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখার এবং হয়তো বা জাতীয় সংহতির জন্য যদি প্রয়োজন হয়, আমরা রবীন্দ্রনাথকেও অস্বীকার করতে প্রস্তুত রয়েছি। সাহিত্যের চাইতে রাষ্ট্রীয় সংহতির প্রয়োজন আমাদের বেশি।' (মাহে নও, তৃতীয় বর্ষ, পঞ্চম সংখ্যা, আগস্ট ১৯৫১) কিন্তু অবস্থার নাটকীয় মোড় নেয়, ১৯৫২ সালে ২১ ফেব্রুয়ারি, ঢাকার রাজপথে 'রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই' দাবিতে ছাত্র-জনতার মিছিলের যখন পশ্চিম পাকিস্তানি পুলিশের গুলিতে রফিক, সালাম, বরকত, শফিউর, জব্বার শহিদ হন। পূর্ব বাংলার বৃহৎ মুসলিম মানসে এই উপলব্ধি প্রবল হয় যে ধর্মগত পরিচয়ে তারা যেমন মুসলমান, জাতিগত পরিচয়ে তেমনি তারা বাঙালি। জাতিসত্তা হঠাৎ করে তৈরী হয়না, বরং হাজার বছর ধরে ভাষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস, নৃ-তাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য ও অর্থনৈতিক সংগঠনের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে এর অবয়ব। বাংলাদেশের বিশিষ্ট বামপন্থী লেখক, বুদ্ধিজীবী বদরুদ্দীন উমর বাঙালি মুসলমানের এই আত্মোপলব্ধিকে স্বদেশ প্রত্যাবর্তন হিসেবে অভিহিত করেন। এই ঐতিহাসিক ঘটনা পূর্ববাংলার কাব্য ও সাহিত্যের গতিপথ পাল্টে দেয়—অসাম্প্রদায়িক বাঙালি জাতীয়তাবাদ, হাজার বছরের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির প্রবহমানতায় নতুন ধারার কাব্য, সাহিত্য রচিত হতে থাকে যা পাকিস্তানি ভাবাদর্শের চিন্তা-দর্শন ও সাহিত্যকে ছুঁড়ে ফেলে, ক্রমে ক্রমে বাংলাদেশে প্রগতিবাদী আধুনিক সাহিত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়। পঞ্চাশের দশকের কবিতায় শামসুর রাহমান, হাসান হাফিজুর রহমান, আলাউদ্দিন আল আজাদ, সিকান্দার আবু জাফর, আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ, শহীদ কাদরী, আল মাহমুদ (পরবর্তীতে মৌলবাদে দীক্ষিত), সৈয়দ শামসুল হক প্রমুখ উল্লেখযোগ্য।
বাঙালির কণ্ঠরোধ ও ভাষা ষড়যন্ত্রের উল্লেখ নিয়ে, ভাষা আন্দোলনের পটভূমিতে রচিত কিছু কবিতার স্মরণযোগ্য পঙ্ক্তি :
নক্ষত্রপুঞ্জের মতো জ্বলজ্বলে পতাকা উড়িয়ে আছ আমার সত্তায়।
মমতা নামের প্লুত প্রদেশের শ্যামলিমা তোমাকে নিবিড় ঘিরে রয় সর্বদাই।
কালো রাত পোহানোর পরের প্রহরে শিউলীশৈশবে
পাখী সব করে রব’ বলে মদনমোহন তর্কালঙ্কার
কী ধীরোদাত্ত স্বরে প্রত্যহ দিতেন ডাক।
তুমি আর আমি, অবিচ্ছিন্ন, পরস্পর মমতায় লীন,
ঘুরেছি কাননে তাঁর নেচে নেচে,
যেখানে কুসুম-কলি সবই ফোটে, জোটে অলি ঋতুর সংকেতে।
...
হে আমার আঁখিতারা তুমি উন্মীলিত সর্বক্ষণ জাগরণে।
তোমাকে উপড়ে নিলে, বলো তবে, কী থাকে আমার?
উনিশশো’ বাহান্নোর দারুণ রক্তিম পুষ্পাঞ্জলি
বুকে নিয়ে আছ সগৌরবে মহীয়সী।
(বর্ণমালা, আমার দুঃখিনী বর্ণমালা: শামসুর রাহমান)
কুমড়ো ফুলে ফুলে নুয়ে পড়েছে লতাটা,
সজনে ডাঁটায় ভরে গেছে গাছটা,
আর আমি ডালের বড়ি শুকিয়ে রেখেছি।
‘‘খোকা তুই কবে আসবি? কবে ছুটি?”
চিঠিটা তার পকেটে ছিল ছেঁড়া আর রক্তে ভেজা।
“মাগো, ওরা বলে সবার কথা কেড়ে নেবে।
তোমার কোলে শুয়ে গল্প শুনতে দেবে না।
বলো, মা, তাই কি হয়?”
...
কুমড়ো ফুল শুকিয়ে গেছে, ঝরে পড়েছে ডাঁটা,
পুঁই লতাটা নেতানো “খোকা এলি?”
ঝাপসা চোখে মা তাকায় উঠানে উঠানে
যেখানে খোকার শব শকুনিরা ব্যবচ্ছেদ করে।
(মাগো, ওরা বলে: আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ)
আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী রচিত 'একুশে ফেব্রুয়ারি' কবিতাটি আলতাফ মাহমুদের সুরে কালোত্তীর্ণ সঙ্গীত হয়ে গেছে যা বাঙালি জাতিসত্তার অনুভব, আবেগ ও অস্তিত্ববাচকতায় ভাস্বর :
আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি
আমি কি ভুলিতে পারি
ছেলেহারা শত মায়ের অশ্রু গড়ায়ে ফেব্রুয়ারি
আমি কি ভুলিতে পারি
আমার সোনার দেশের রক্তে রাঙানো ফেব্রুয়ারি
আমি কি ভুলিতে পারি।
[চলবে]
[লেখক জীবন: সময় অসময় দুঃসময়, সম্পাদক: তপোধীর ভট্টাচার্য, গ্রন্থ থেকে নেওয়া]
